-শাকিল মাহফুজ:: এই গবেষণায় হেলাল হোসেন কবিরকে একই সঙ্গে কবি ও সাংবাদিক হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তার কাব্যগ্রন্থ “প্রহরীর নষ্ট চাবুক” এবং সাংবাদিকতা কার্যক্রমে ব্যক্তিজীবনের আবেগ, দেশপ্রেম ও সামাজিক বাস্তবতার অনন্য সমন্বয় প্রতিফলিত হয়েছে। গবেষণার জন্য ব্যবহৃত হয়েছে গুণগত পদ্ধতি—কবিতার পাঠ-বিশ্লেষণ, সাংবাদিকতার প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ আলাদা। দেখা যায়, কবির সাংবাদিকতা তার কবিতায় বাস্তবতাকে সমৃদ্ধ করেছে, আর কবিতা তার সাংবাদিকতায় এনেছে কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। গবেষণাটি সমসাময়িক বাংলা সাহিত্য আলোচনায় আঞ্চলিক কণ্ঠস্বরের গুরুত্ব বাড়াবে।
পটভূমি:
বাংলা সাহিত্য ও সাংবাদিকতা পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশসহ অনেক সাহিত্যিক সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জাতীয় পর্যায়ের সাহিত্যিকদের ওপর বহু গবেষণা হয়েছে, কিন্তু আঞ্চলিক কবি ও সাংবাদিকদের নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা সীমিত। বাংলাদেশের তিস্তা গাঘেঁষা জেলা লালমনিরহাট যেমন সবুজ শ্যামলে ভরপুর, তেমনি উত্তরে লম্বা কাঁটাতারের সীমান্ত বেদনা উঁকি দেয় মানুষের মনে। সেই জেলার বেড়ে উঠেছেন আজকের কবি হেলাল হোসেন কবির।
গবেষণার উদ্দেশ্য:
সাংবাদিকতার কারণে বার বার মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরেছেন তিনি। তাই হেলাল হোসেন কবিরের জীবন ও সাংবাদিকতার কার্যক্রম নথিভুক্ত করা জরুরী। তার কবিতার বিষয়বস্তু ও শৈলী বিম্লেষন করে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা করা। দেশ, সমাজ ও প্রান্তিক জনপদের জন্য লিখে যাচ্ছেন তিনি। তার সাড়াজাগানো লেখাগুলোকে চিহ্নিত করে স্থানীয় সাহিত্যচর্চায় তার অবদান নির্ণয় করা।
সাহিত্য পর্যালোচনা:
হেলাল হোসেন কবির ছাত্রজীবন থেকেই লেখা লেখি করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। তার লেখনি মানে প্রতিবাদ। সমসময়ে সামাজিক অবস্থাকে তুলে ধরেছেন কলমের মাধ্যমে। বিশষ করে কবিতা ও ছোট্ট গল্প সমাজ পরিবর্তনের ডাক হয়ে উঠে। তার প্রবন্ধ ও নিবন্ধনতে উঠে আসে পুরানো ও নতুন তথ্যের গাঁথনি। তিনি নিয়মিত সাহিত্য লেখেন বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকা, ম্যাগাজিন, অনলাইন ও মুদ্রিত সাহিত্য সাময়িকীতে। দীর্ঘদিন ধরে লেখেন কবি। যদিও”প্রহরীর নষ্ট চাবুক” তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ। সেখানেও প্রতিটি কবিতায় ক্ষমতার চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচার ডাক দিয়েছেন, বাংলাদেশের মানচিত্রকে ভালোবাসার মাধ্যমে আগলে ধরেছেন কবিতার মাধ্যমে, প্রেম বিরহের কথাও বলেছেন, উত্তর জনপদকে বৈষম্য থেকে দুর করতে আওয়াজ তুলেছেন কবিতার মাধ্যমে, জলবায়ুর কারণে প্রকৃতিকে ধবংসের হাত থেকে রক্ষা করতে বলেছেন, সেই সাথে তরুণ সমাজকে ভালো থাকার আহবান জানিয়েছে কবি।
কবিতা বিশ্লেষণ:
হেলাল হোসেন কবির এর কবিতাকে ছোট করে দেখার কোন অবকাশ নেই, বরং যতই পড়ি ততই ভালো লাগে। মনে করি আর ভাবি কবিতার লাইনের গাঁথনি কি নিখুঁত বিন্যাসের সাথেই যুক্ত করে করেছেন সমাজের চিত্র। দুর দেশ থেকে তার লেখা পড়ে ভাবছিলাম আমি তার সমালোচক হবো না’কি আলোচক হবো তা ভাবতে সময় লেগেছে, দেরিও হয়েছে। প্রথমে অনলাইনে তার কয়েকটি কবিতা পড়েছিলাম। বিশেষ করে তার লেখা “আমাকে চিনবেনা” কবিতায় পুরো বাংলাদেশ সমসাময়িক ঘটে যাওয়া ঘটনা তুলে ধরেছেন। তারপর থেকে কবিকে আবিস্কারের চেষ্টা করতে থাকি। বহু কষ্টে তার সাথে যোগাযোগ করে “প্রহরীর নষ্ট চাবুক” বইটি সংগ্রহ করি। বইটি সংগ্রহ করার পিছনে দারুণ ঘটনা আছে। বইটি কয়েক হাত হয়ে আমার কাছে পৌঁছে যায়। কবি প্রথমে বইটি কুড়িয়ার করেন ঢাকায়, ঢাকা থেকে বইটি যায় নেত্রকোনায় তারপর যায় কুমিল্লাতে এরপর আমার এক পরিচিত লোক নিউইয়র্ক আসলে তার মাধ্যমে বিমানে করে পৌঁছে যায় আমার কাছে।
বইটি হাতে পেয়ে দেখলাম খুব চমৎকার প্রচ্ছদ। প্রচ্ছদ করেছেন মুহিন রায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশ। কাগজগুলো সস্থা হলেও ভিতরের কবিতাগুলো থেকে আগুন জ্বলে। প্রহরীর নষ্ট চাবুক কাব্যগ্রন্থে হেলাল হোসেন কবির এর কবিতা-“আমি সেই বাংলাদেশ, বুলেটের সামনে বুক, না সরকার না জনগণ, ২০০৯ সাল, জুজুর ভয়, লাশের মুক্তি, নতুন সনদ, ট্রিগার, হক কথা, রিমান্ডে বাংলাদেশ ” এই কবিতাগুলো নতুন করে ভাবিয়ে তুলে আমাকে। বিশেষ কর না সরকার না জনগণ কবিতাটি ২০১২ সালের লেখার ভাবনা বাস্তবে রূপ পায় এক যুগ পরে হুবহু ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার গণঅভুত্থানের প্রতিচ্ছবি। আমার কাছে তাই মনে হয়েছে। তার লেখা “তোমরা আমাকে কবি বলো” কবিতাটি পড়ে প্রথমে হাসি পেয়েছে, তারপর মনোযোগ সহকারে ভেবে দেখি সর্বনাশ ঘটিছে সেখানে, বিশ্ব মোড়লের ক্ষমতাকে এভাবেও লিখে প্রতিবাদ করা যায়! ঠিক “একটি ঘোষণা” কবিতায় যেভাবে বাংলাদেশে বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছেন। প্রেম বিরহের কথা প্রকাশ করেছেন কবি, “কি করবো বলো, চাঁদ হবো, নষ্ট ছেলে, ভয়ংকর ভালোবাসা, শুধু একজন থাকে, বুক পকেটের জানাজা, মনটা দিলাম, জমিদারের কাছে প্রশ্ন, শুনছেন, অসফল, দোষারোপ, অকথ্য” সহ আরো বেশ কবিতায়। কবি “ক্ষুধা, ভূগোল, পথ সাক্ষাৎ, ঋতুর পালাবদল, জ্বলন্ত বাতিটার আজ অসুখ ধরেছে, মেরুদণ্ড, নিঃসঙ্গতা” কবিতায় ভাত গণতন্ত্র ও নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা ফুটে তুলেছেন। কবি যেমন প্রতিবাদ করছেন তেমনি “কালিমা” কবিতায় ও “পাপ থাকিলে” কবিতায় এবং “ক্ষমা করে দাও” কবিতার মাধ্যমে স্মৃষ্টিকর্তাকে নালিশ জানিয়েছেন, সেই সাথে “এসো মনের পশুকে জবাই করি” কবিতায় মানুষ যে নিষ্পাপ নয় তা বুঝিয়েছেন, সেই সাথে “মনের আরাধনা” কবিতায় ধর্মের নাম করে মুখোশধারিদের কথা সোজাসাপটা ভাবে বলেছেন। মোটকথা “প্রহরীর নষ্ট চাবুক”কাব্যগ্রন্থে ৮৪ টি কবিতা রয়েছে সবগুলো আমার কাছে ভালো লেগেছে। পড়েছি আর জল্পনা কল্পনা করে নিজের মাঝে হারিয়ে গেছি। একজন মফস্বলের সাহসী লেখনির হাত কবি হেলাল হোসেন কবির এর দীর্ঘায়ু কামনা করি।
শূন্যস্থান:
হেলাল হোসেন কবিররা এই সমাজে হয়তো লাঞ্ছনা বঞ্চনা আর বৈষম্যের মাঝে বেড়ে উঠে। সমাজ তাকে কতটুকু মূল্যায়ন করলো হয়তো সেই ধার ধারেনা। নিরবে নিভৃতে লেখে যান, হয়তো একটা সময় পরিবারের কাছে কথা শুনতে হবে হবে শূন পকেটের জন্য। তবুও তিনি লিখে যাবেন এভাবেই। আমাদের দেশে প্রান্তীক কোন কিছু তুলে ধরা না রাষ্ট্র, শুধু যেটা ভাইরাল হয় তার পিছনে দু’চারদিন ছুটোছুটি, আরকি ! হেলাল হোসেন কবিরকে নিয়ে কোনো একাডেমিক গবেষণায় এখনো তার সাহিত্যকর্ম আলোচিত হয়নি। রাষ্ট্রের উচিৎ তাকে সম্মান জানানো।
সাংবাদিকতা: সংগঠন ও সমাজকর্ম:
শুরুতে বলেছি কবি হেলাল হোসেন কবির সাংবাদিকতা সাহিত্যকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা তার কবিতায় বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। কবিতা তাকে সাংবাদিকতায় আবেগময় ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। দুই পরিচয়ের সমন্বয় তার সাহিত্যকণ্ঠকে স্বতন্ত্র করেছে। যার কারণে তিনি হামলার শিকার হয়েছে, মৃত্যুর মুখে পড়তে হয়েছে বার বার। এর মাঝেও তিনি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় আছেন স্থানীয় সমস্যা ও স্থানীয় সংস্কৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন।
উপসংহার:
হেলাল হোসেন কবির নিয়ে এই গবেষণা সমসাময়িক বাংলা কবিতার একটি অনুল্লেখিত অধ্যায় উন্মোচন করবে। আঞ্চলিক সাহিত্য ও সাংবাদিকতা উভয়ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ। তার কবিতা দেশপ্রেম, মানবিকতা ও সামাজিক সচেতনতার প্রতিচ্ছবি। সাংবাদিকতা ও কবিতা পরস্পরকে সমৃদ্ধ করেছে, ফলে তার সাহিত্যচর্চা অনন্য বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। কবি একই সঙ্গে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—দুটি ভিন্ন ধারাকে কীভাবে একজন মানুষ সমান্তরালে বহন করেছেন, তা বোঝার সুযোগ দেবে। এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, আঞ্চলিক কণ্ঠস্বরও জাতীয় সাহিত্যের পরিসরে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
(লেখক: শাকিল মাহফুজ, লেখক ও গবেষক, বাফেলো- নিউইয়র্ক)
