লালমনিরহাটের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর টানা বৃষ্টির কারণে তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে ভাটিতে থাকা লালমনিরহাটের ৪টি উপজেলার তিস্তা নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে উজানে থাকা ফ্লাড বাইপাসসহ ঘর-বাড়ি ও স্থাপনা। রাত গভীর হলে এসব এলাকায় পানি ঢুকে প্লাবিত হয়ে দুর্ভোগের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও পানির তেড়ে বেশ ক্ষয়-ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এদিকে উজানের ঢল আসায় তিস্তা নদী তীরবর্তী মানুষেরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিরাপদে থাকতে সবধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে ডালিয়া এলাকার ফ্লাড বাইপাস। এতে ভাটিতে থাকা ঘর-বাড়িসহ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকিতে পড়েছে।
সোমবার (১৩ জুলাই) সন্ধ্যা ৬টায় দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় পানির সমতল ৫২.১৮মিটার (বিপদসীমা ৫২.১৫মিটার) যা বিপদসীমার ৩সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৬টার দিকে লালমনিরহাটের তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া পয়েন্টে নদীর পানির উচ্চতা রেকর্ড করা হয় পানির সমতল ৫২.২২মিটার (বিপদসীমা ৫২.১৫মিটার) যা বিপদসীমার ৭সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর সকাল ৯টায় বিপৎসীমার ৪সেন্টিমিটার উপরে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে। তবে দুপুর ১২টায় যা বিপদসীমার ৫সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সর্বশেষ বিকাল ৩টায় বিপদসীমার ১০সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
পাউবো বলছে, আগামী ২৪ ঘন্টায় উজানের ভারী ঢল এসে নদী এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এ সময় বিপৎসীমার উপরে পানি প্রবাহ অব্যাহত থাকবে।
পানি বৃদ্ধি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) তিস্তা ব্যারেজের সব ৪৪টি জলকপাট খুলে দিয়েছে।
তিস্তা নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল ও চরের অনেক ঘর-বাড়িতে পানি প্রবেশ করতে শুরু করেছে।
বেশ কিছু এলাকায় ফসলের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে ফসলের ক্ষয়-ক্ষতিসহ গবাদী পশুপাখি নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে। দুশ্চিন্তায় রাত পার করছে তিস্তাপাড়বাসী।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ থেকে ৪৮ঘন্টায় দেশের অভ্যন্তরে ও উজানে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এতে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।
দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারাজের ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ রায় বলেন, উজানের পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি প্রবাহ সোমবার সন্ধ্যা থেকে আবারও বেড়েছে। ব্যারাজ রক্ষার্থে সবগুলো জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, দুই থেকে তিনদিনের মাথায় পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে।
লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনীল কুমার বলেন, কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে তিস্তার পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছে। তীরবর্তী এলাকাগুলোর মানুষকে অগ্রিম জানানো হয়েছে যেন তারা প্রস্তুত থাকে। ক্ষয়-ক্ষতি কমাতে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ড. মোঃ সাইখুল আরিফিন বলেন, বর্তমানে তিস্তা তীরবর্তী অঞ্চলে রোপা আমন, চিনা বাদাম ও শাক-সবজির চাষ হচ্ছে। পানি যদি তিন থেকে চার দিন স্থায়ী হয়, তাহলে কৃষকদের ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হতে পারে। তবে এক থেকে দুই দিনের মধ্যে পানি নেমে গেলে তেমন ক্ষতি হবে না। আমরা চেষ্টা করছি কৃষকদের ক্ষতি যেন কম হয়।
এদিকে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিকাল ৩টায় ধরলা নদীর শিমুলবাড়ি পয়েন্টে পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় পানির সমতল ৩০.২৬মিটার (বিপদসীমা ৩০.৮৭মিটার) যা বিপদসীমার ৬১সেন্টিমিটার নিচে দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
লালমনিরহাটের ধরলা নদীর ভাঙনে মোগলহাট ইউনিয়ন ছাড়াও লালমনিরহাট সদর উপজেলার আরও ২টি (কুলাঘাট ও বড়বাড়ী) ইউনিয়নে ভাঙ্গন অব্যাহত রয়েছে।
উল্লেখ্য যে, লালমনিরহাটের তিস্তা, ধরলা, রত্নাই, স্বর্ণামতি, সানিয়াজান, সাকোয়া, চাতলা, মালদহ, ত্রিমোহীনি, মরাসতি, গিরিধারী, গিদারী, ধোলাই, শিংগীমারী, ছিনাকাটা, ধলাই ও ভেটেশ্বর নদীতে বন্যার পানি বৃদ্ধির ফলে কৃষকের স্বপ্ন ভঙ্গের খবর পাওয়া গেছে।