যেকোনো ভোটের সময় সবাই বলেন ব্রিজ হবে, কিন্তু ভোট শেষ হলে সেই ব্রিজের আর কোনো খোঁজ থাকে না- এই আক্ষেপই এখন লালমনিরহাটের সদর উপজেলার ২নং কুলাঘাট ইউনিয়নের শিবেরকুটি গ্রামের মানুষের নিত্যদিনের বাস্তবতা।
এখানকার বাসিন্দা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, মহান স্বাধীনতার প্রায় ৫৫বছর ধরে শুধু প্রতিশ্রুতিই শুনে যাচ্ছেন, বাস্তবে কোনো স্থায়ী ব্রিজ দেখেননি। লালমনিরহাট জেলার লালমনিরহাট সদর উপজেলার ২নং কুলাঘাট ইউনিয়নের শিবেরকুটি এলাকায় শিবেরকুটি-ধাইরখাতা সংযুক্ত রত্নাই নদীর ওপর ৯৫মিটার একটি ব্রিজের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু আজও সেখানে কোনো স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণ না হওয়ায় অন্তত ৪টি গ্রামের প্রায় ১৫ থেকে ২০হাজার মানুষ নৌকা ও বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভর করেই চলাচল করছেন। বর্ষা মৌসুমে নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকোই তাদের একমাত্র ভরসা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, স্থানীয়ভাবে রত্নাই নদী নামে পরিচিত এই নদীতে পানি কমে যাওয়ায় শিবেরকুটি সরেয়ারতল নামক স্থানে নদী পারাপারের জন্য তৈরি করা নড়বড়ে বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন নারী-পুরুষ, শিশু ও বৃদ্ধরা ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। সামান্য অসাবধানতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকলেও তাদের বিকল্প কোনো পথ নেই।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শিবেরকুটি, দক্ষিণ শিবেরকুটি, বনগ্রাম ও ধাইরখাতাসহ আশপাশের অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াত নির্ভর করছে এই একটি বাঁশের সাঁকোর ওপর। ছাত্র-ছাত্রীদের স্কুলে যাওয়া-আশা, কৃষকদের হাটে-বাজারে যাওয়া কিংবা অসুস্থ ও বয়স্ক রোগীদের চিকিৎসার প্রয়োজনে বাইরে যাওয়ার প্রতিটি পথেই সামনে পড়ে কাঁপতে থাকা সেই বাঁশের সাঁকো।
স্থানীয়রা জানান, নদীর ওপর স্থায়ী ব্রিজ না থাকায় সময় মতো কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে স্থানীয় খুচরা ব্যাবসায়ীদের নিকট ফসল বিক্রি করতে হয়। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক, ছাত্র-ছাত্রী ও বয়স্করা। এই বাঁশের সাঁকোটি প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম শেষে তৈরি করেন স্থানীয়রা।
শিবেরকুটির বাসিন্দা মোঃ রেজাউল করিম বলেন, ফসল উৎপাদন করলেও বাজারে নিতে পারি না, কারণ বাঁশের সাঁকো দিয়ে বড় যানবাহন চলাচল অসম্ভব। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়। এতে তাদের বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, আমাদের এলাকায় ভোটের সময় সবাই এলেও ভোট শেষ হলে কেউ আর খবর নেয় না।
এলাকার একাধিক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও পরে আর কেউ খোঁজ নেয় না। তাই সরেয়ারতল ঘাটে ব্রিজও আর হয়না।
শিবেরকুটি গ্রামের বাসিন্দা ও কোদালখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তারিকুল ইসলাম বলেন, রত্নাই নদীর সরেয়ারতল ঘাটের নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর উপর দিয়ে মোটর সাইকেল চালিয়ে কর্মস্থলে যাই। ২০১০ সালে বর্ষাকালে নৌকায় পার হওয়ার সময়ে নদীতে মোটর সাইকেলসহ পড়ে গিয়েছিলাম। স্থানীয় লোকজন আমাদের উদ্ধার করেছিলেন। ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি। ওই দিনের কথা মনে হলে এখনও শিউরে উঠি। কবে যে সরেয়ারতল ঘাটে পাকা ব্রিজ নির্মাণ করা হবে?
একই এলাকার বাসিন্দা ও পশ্চিম বড়ুয়া রোটারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রুনা লায়লা বেগম বলেন, লালমনিরহাট শহর, বিভাগীয় শহর রংপুর ও রাজধানী ঢাকায় যেতে হয়। তবে যেখানেই যাই না কেন কিংবা গ্রামের বাড়িতে আসা-যাওয়া করতে হলে রত্নাই নদীর সরেয়ারতল ঘাট পাড় হতে হয়। ওই ঘাট পাড় হতে সব সময় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়।
কুলাঘাট ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য মোশাররফ হোসেন মুকুল বলেন, আমাদের এলাকাটি রত্নাই নদী দ্বারা বিচ্ছিন্ন। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এ এলাকার প্রায় ২০হাজার মানুষের কাঙ্খিত জীবনমান উন্নয়ন হচ্ছে না। আর্থ-সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়ছে যোগাযোগ ব্যবস্থা, সহজে শিক্ষা-চিকিৎসা ও উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে নিতে পারছে না। এ জন্য দ্রুত ব্রিজ নির্মাণের দাবি জানাচ্ছি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবীব বলেন, “দেশব্যাপী গ্রামীণ সড়কে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ নির্মাণ” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় গৃহীত স্কিম যাচাই-বাছাই কমিটির নির্দেশনা মোতাবেক লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলাধীন শিবেরকুটি সরেয়ারতল ঘাট এলাকায় ব্রিজ নির্মাণ/ পুননির্মানের লক্ষ্যে ডিপিপি প্রস্তুত চূড়ান্ত করার জন্য কমিটি গঠন করা হয়। উক্ত কমিটি কর্তৃক পরিদর্শন করতঃ মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন পূর্বক প্রতিবেদন প্রেরণ করা হয়েছে।
লালমনিরহাট সদর উপজেলা প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবীব, লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী এস এম ফুয়াদ হাসান, লালমনিরহাট সড়ক বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী (চঃদাঃ) মোঃ আনোয়ার হোসেন ও লালমনিরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনোনীতা দাস স্বাক্ষরিত “দেশব্যাপী গ্রামীণ সড়কে গুরুত্বপূর্ণ ব্রিজ নির্মাণ” শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় গৃহীত স্কিম যাচাই-বাছাই কমিটির পরিদর্শন প্রতিবেদনের মন্তব্যে উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত ব্রিজের স্থানে বর্তমানে বাঁশের সাঁকো/ ব্রিজ আছে এবং বর্ষাকালে নৌকায় মানুষ/ যানবাহন পারাপার হয়। ব্রিজটি নির্মাণ অতীব প্রয়োজন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয় লালমনিরহাটের সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট জেলার ৫টি উপজেলায় মোট ৮২টি ব্রিজ নির্মাণের অনুমোদনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।