মাদক ও জুয়ার প্রতিবাদ করায় লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলা দূর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া (সিঙ্গিমারী) গ্রামের হামলার শিকার কলেজ শিক্ষক আরিফুল ইসলাম (৩৫) মারা গেছেন। টানা ২১দিন অচেতন থাকার পর শুক্রবার রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) তাঁর মৃত্যু হয়।
এদিকে আরিফুলের মৃত্যুর খবর গ্রামের ছড়িয়ে পড়লে রাতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বাড়ি-ঘরে ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন এলাকাবাসী। পরে গভীর রাতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
আরিফুল ইসলামের বাড়ি লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার দুর্গাপুর ইউনিয়নের গন্ধমরুয়া (সিঙ্গিমারী) গ্রামে। স্ত্রী মাকামাম মাহমুদা ছাড়াও তাঁর ২বছর ৪ মাস বয়সী একটি মেয়ে ও ১৬দিনের নবজাতক একটি ছেলে আছে। লালমনিরহাট সরকারি পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের এই শিক্ষক নিজ গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় মাদক, জুয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১ আগস্ট বিকেলে কলেজ থেকে বাড়িতে ফেরার পথে গন্ধমরুয়া (সিঙ্গিমারী) গ্রামে ধারালো অস্ত্র নিয়ে আরিফুলের ওপর হামলা করে দুর্বৃত্তরা। গুরত্বর আহত অবস্থায় তাঁকে উদ্ধার করে প্রথমে লালমনিরহাট সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালসহ কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে তাঁকে সর্বশেষ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়। টানা ২১দিন অচেতন থাকার পর গতকাল রাত ৮টার দিকে তিনি মারা যান।
আরিফুলের ওপর হামলার ঘটনায় ২ আগস্ট তাঁর বাবা আবু বক্কর সিদ্দিক ১০জনকে আসামি করে আদিতমারী থানায় মামলা করেন। মামলার প্রধান আসামি রহিদুল ইসলামকে ১৩ আগস্ট গ্রেফতার করে র্যাব। গতকাল রাতে আরিফুলের মৃত্যুর সংবাদ এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে রহিদুলসহ ৭জনের বাড়িতে হামলা-ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেন স্থানীয় লোকজন। পরে গভীর রাতে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
লালমনিরহাট ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা মুক্তি মাহমুদ বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ৪টি বাড়ির আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছেন।

শনিবার দুপুরে গন্ধমরুয়া (সিঙ্গিমারী) গ্রামে আরিফুলের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, স্বজনেরা আহাজারি করছেন। প্রতিবেশী ও গ্রামের লোকজন বাড়িতে ভিড় করছেন। নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন আরিফুলের স্ত্রী মাকামাম মাহমুদা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে মাহমুদা বলেন, আমার স্বামী মানুষ গড়ার কারিগর ছিলেন। তিনি মাদক, জুয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তাহলে তাঁকে কেন এভাবে অকালে চলে যেতে হলো? নিজের কোলের নবজাতক সন্তানকে দেখিয়ে বলেন, আমার সন্তানদের যারা এতিম করল, তাদের যেন ফাঁসি হয়।
এদিকে আরিফুলের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে দুপুরে তাঁর বাড়িতে যান লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মুহাঃ রাশেদুল হক প্রধান। তিনি আরিফুলের নবজাতক সন্তানকে কোলে নিয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যা যা করা সম্ভব, সবকিছু করার আশ্বাস দেন।
আদিতমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ নাজমুস সাকিব সজীব বলেন, আগের হত্যাচেষ্টা মামলাটি এখন হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হবে। আদালতে এ সংক্রান্ত একটি আবেদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, মামলার প্রধান আসামি রহিদুল কারাগারে আছেন। অন্য আসামিরা পলাতক ও জামিনে আছেন।
নিহত আরিফুল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফলিত রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাঁর স্ত্রী মাকামাম মাহমুদাও একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। আরিফুলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে প্রায় ২৫লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লালমনিরহাট অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ এস এম আবু হাসনাত।
পরিবারের সদস্যরা জানান, আজ বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন চত্বরে আরিফুল ইসলামের প্রথম জানাজা হয়। আগামীকাল রোববার সকাল ১০টায় মোগলহাট ফুটবল খেলার মাঠে তাঁর দ্বিতীয় জানাজা হবে।