লালমনিরহাট জেলার বুড়িমারী স্থলবন্দরের ব্যবসায়ীরা রপ্তানি পণ্যের উপর ভারতের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে নতুন সরকারের কার্যকর ভূমিকার দাবী জানিয়েছে।
দেশের তৃতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর বুড়িমারী এখন ব্যবসা বাণিজ্যহীন, শত শত লোড-আনলোড শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, সিএন্ডএফ এজেন্ট কর্মচারীরা বেকার জীবন যাপন করছে। বন্দরের আশ-পাশে নেই আগের জৌলুস।
৫ আগস্ট এর পরবর্তী অন্তর্বতী সরকারের সাথে নানা টানপোড়ন শুরু হয় প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে, যার খড়গ এসে পড়ে দেশের ব্যবসা বাণিজ্যের উপর, দেশের মানুষের চাহিদা উপেক্ষা করতে না পারায় ভারত থেকে পণ্য আমদানি করলেও যায়নি দেশের রপ্তানি পণ্য। সরকারের কুটনৈতিক ব্যর্থতায় দেশের রপ্তানি পণ্যের উপর ভারত বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা দেয়, এতে ব্যবসা-বাণিজ্যের উপর ধ্বস নেমে আসে, ব্যবসা বান্ধব সরকার না থাকায় কার্যকর কোন উদ্যোগ নেওয়া হয়নি স্থবিরতা দুর করতে। এতে দীর্ঘ ১৬মাসে ট্রাক লোড-আনলোড শ্রমিক, পরিবহন বন্দোবস্ত শ্রমিক, সিএন্ডএফ এজেন্ট কর্মচারীসহ প্রায় ৫হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা হারায় ব্যবসা, সরকার হারায় রাজস্ব, দেশের শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো হারায় তাদের শত শত কোটি টাকার বাজার।
দেশের সবচেয়ে বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রান গ্রুপ, আর এফ এল গ্রুপ, সজীব গ্রুপ, আকিজ গ্রুপ, স্কয়ার টয়লেট্রিজ, বেঙ্গল প্লাষ্টিকসহ একডজন কোম্পানির বেভারেজ কোলা, প্যাকেটজাত খাদ্য, স্যানিটারি, ফার্নিচার, ফুড আইটেম ভারতের সেভেন সিষ্টার্সসহ একাধিক রাজ্যে বিশাল বাজার তৈরী করে, তাদের শত শত কোটি টাকার রপ্তানি পণ্য বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন ভারতে প্রেরন করা হতো, ভারতের নিষেধাজ্ঞায় দীর্ঘ ১৬ মাস যাবত বেশ কিছু পণ্য রপ্তানি বন্ধ রয়েছে, এতে দেশীয় কোম্পানিগুলোর বড় একটি বাজার হাতছাড়া হয়ে যাবার উপক্রম হয়েছে।
এর পাশাপাশি আমাদের গার্মেন্টস শিল্পের পরিত্যাক্ত ঝুটের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে ভারত, ঝুট থেকে পরিত্যাক্ত তুলা, মশারি এবং তৈরী পোষাক ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের বাজার দখল করেছে। গত ১৬ মাসে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞায় ঝুট থেকে উৎপাদিত তুলা শিল্পাঞ্চলে ময়লার ভাগাড়ে রুপান্তরিত হয়েছে।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী সামীম খান জানান, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর এলাকার পরিত্যক্ত ঝুট থেকে উৎপাদিত তুলা আমরা ভারতের বিভিন্ন অঙ্গ রাজ্যে রপ্তানি করে দেশের জন্য বৈদেশিক অর্থআনি। সেই অর্থ দিয়ে দেশ সমৃদ্ধ হয়, হাজার হাজার বেকার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে, অথচ সরকারের কুটনৈতিক ব্যর্থতায় ব্যাবসা বাণিজ্য আজ স্থবির, দেশীয় শিল্পের বাজার নষ্ট বৈদেশিক মুদ্রার আয় বন্ধ। নতুন সরকারের কাছে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আমাদের অনুরোধ দ্রুত কুটনৈতিক ভাবে এটি সমাধান করে রপ্তানি পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা নিক নতুন সরকার।
নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জের ঝুটতুলা ব্যবসায়ী জাকির হোসেন জানান, পরিত্যাক্ত ঝুট তুলা ভারতে রপ্তানি করে আমার প্রতিষ্ঠান, এতে শতাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান তৈরী হয়েছে, প্রতিদিন গড়ে ২০/৩০ গাড়ী ঝুটতুলা আমার প্রতিষ্ঠান বুড়িমারি বন্দর দিয়ে ভারতে প্রেরন করত, এতে পরিবহন ব্যবসায়ীর পাশাপাশি রপ্তানি পণ্যের বিপরীত বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসতো, গত ১৬ মাস ধরে রপ্তানি বন্ধ থাকায় ব্যবসা বাণিজ্য বন্ধ হয়ে সকল শ্রমিককে ছাটাই করতে বাধ্য হয়েছি, পাশাপাশি শত শত গাড়ি ঝুটের তুলা আমার গোডাউনে পড়ে আছে।
বুড়িমারী স্থল বন্দর সিএন্ডএফ এজেন্ট ব্যবসায়ী এসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক এস এম নিয়াজ নাহিদ জানান, দেশের দ্বীতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার কবলে আজ স্থবির, ভারতের বাজারে আমাদের রপ্তানি পণ্যের বড় বাজার থাকলেও নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা ১৯টি পণ্য পাঠাতে পারছিনা, এতে আমাদের দেশীয় শিল্প বৈদেশিক মুদ্রা আহরনে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে, সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে, হাজার পাঁচেক শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। নতুন নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা থাকবে দ্রুত কুটনৈতিক আলোচনায় এগুলো নিরসন করার।
তিনি আরও জানান, দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করতে ব্যবসা বাণিজ্য সচল করার বিকল্প নেই, বুড়িমারী বন্দরের অবকাঠামো উন্নয়ন দরকার, বন্দরের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে চার লেন সড়ক নির্মাণ জরুরী, ইতিমধ্যে জেলার দ্বায়িত্ব প্রাপ্ত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে বিষয়গুলো উপস্থাপন করা হয়েছে, মন্ত্রী মহোদয় জেলার উন্নয়নে বিষয়গুলো নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেবার জন্য ১৮০দিনের কর্মপরিকল্পনা তৈরীর নির্দেশ দিয়েছেন।
বুড়িমারী স্থলবন্দরের দ্বায়িত্বরত কাস্টমস শুল্ক বিভাগের সহকারী মুহাম্মাদ মহি উদ্দিন জানান, দেশের অর্থনীতি সচল করতে রপ্তানি পণ্যের অচলাবস্থা কাটাতে হবে, এতে বৈদিশিক মুদ্রার পাশাপাশি কর্মসংস্থান বাড়বে। ভারতে পণ্য রপ্তানিতে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে দ্রুততম সময়ে এগুলো নিরসনে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে আমরা অবগত করেছি।